মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভৌগোলিক পরিচিতি

(ক) উপজেলার নামকরণঃ কিশোরগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা হচ্ছে করিমগঞ্জ। নামটির প্রথম অংশ ‘করিম’ এবং দ্বিতীয় অংশ ‘গঞ্জ’ এ দুটির সংযোগে হয়েছে করিমগঞ্জ। অর্থাৎ করিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজার বা গঞ্জ। কে এই করিম ? করিমগঞ্জ স্থানটি কোন করিমের অধীনে ছিল কি-না তা যাচাই ও ইতিহাস পর্যালোচনায় ঈশা খাঁ’র সময়ে (১৫৩৭-১৫৯৯) বাংলার বার ভূঁইয়ার মধ্যে করিমদাদ মূসাজাঁই নামে একজনের নাম জানা যায়। তবে তিনি এই এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন কি-না তা জানা যায়নি। করিমদাদ মূসাজাঁই ছাড়া এ এলাকায় সম্পৃক্ত আর যে দুজন করিমের নাম পাওয়া যায়; তাঁরা হলেন বৌলাই সাহেব বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা মোগল প্রতিনিধি আল শায়খ আব্দুল করিম ও অন্যজনের নাম সি.এস. রেকর্ডে তালুক করিম খাঁ নামে উলেস্নখ আছে। তিনি আনুমানিক ১৬২৫ সালে এ অঞ্চলে আগমন করেন। অন্যজন ঈশা খাঁ’র ১০ম অধঃসত্মন করিমদাদ খাঁ।

জমিদারী আমলে করিমগঞ্জ বাজারটি বৌলাই জমিদার বাড়ীর অধীনে ছিল। ফলে এটি বৌলাই বাড়ীর পূর্ব পুরম্নষ মীরে বহর আল শায়খ আব্দুল করিম এর নাম থেকে করিমগঞ্জ নামকরণ হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। ঈশা খাঁ’র বংশের করিমদাদ খাঁ উনিশ শতকের প্রথম দিকের লোক এবং করিমগঞ্জ তার জমিদারীর আওতাধীন ছিল না। স্বাধীনচেতা জমিদার নেতা বীর ঈশা খাঁ’র বিদ্রোহ মোগল সম্রাটকে ব্যতিব্যসত্ম করে তুলেছিল। বিদ্রোহ দমনের জন্য মোগল নৌ সেনাপতি, বৌলাই সাহেব বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা মীরে বহর আল শায়খ আব্দুল করিম এঁর নামানুসারেই এ অঞ্চল করিমগঞ্জ নামে পরিচিতি লাভ করে।

১৯০৬ খ্রিঃ সরকারী নোটিশের মাধ্যমে ভৈরব, অষ্টগ্রাম, নাগরপুর, মীর্জাপুর, ঘাটাইল, সরিষাবাড়ী, বারহাট্টা, মাদারগঞ্জ, খালিয়াজুরী ও মুক্তাগাছা'কে পূর্ণাঙ্গ থানা করা হয়। ১৯০৯-১৯১০ সালে পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর, করিমগঞ্জ ও তাড়াইল থানা স্থাপন করা হয়। তখন থেকেই করিমগঞ্জ নামটি ব্যাপকতা লাভ করে।

(খ) উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থানঃ করিমগঞ্জ উপজেলাটি ২৪২২র্ এবং ২৪৩২র্ উত্তর দ্রাঘিমাংশে এবং ৯০৪৮র্ এবং ৯১০১র্ পূর্ব অক্ষাংশে অবস্থিত।

(গ) ইতিহাস ও ঐতিহ্যঃ বাংলার সমতল ভূমিতে সর্পিল নদী বেষ্টনে পলল অঞ্চলের এক গভীর ঐতিহ্যের বিস্তৃত উর্বর ভূমি পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল। ব্রহ্মপুত্র নদের বন্ধনসূত্রে এবং স্রোতবাহিত পলি দিয়ে গড়ে উঠেছে এর গ্রামাঞ্চল। শাখা নদী ও উপ নদীর বেষ্টনে গড়ে উঠেছে সরল, ভাগ্যান্বেষী, মৎস্যজীবী, শরণার্থী ও আদিবাসীদের মিশ্রিত জনসমাজ।

 

এ বিস্তৃত জন সমাজে নিক্ষিপ্ত হয়েছে অর্জুনের গাম্ভীর, ঝলসে উঠেছে ঈশা খাঁ’র তরবারী - এরই বুকেঝলসে উঠেছে ব্রিটিশ কামান, পাকিসত্মানীদের বুলেট। এর একদিকে বীরত্বপূর্ণ গণসংগ্রামের ইতিহাস, অন্যদিকে লোক সাহিত্য ও লোকজশিল্পের বিশ্বখ্যাত ঐতিহ্য। ব্রহ্মপুত্রের পূর্বে এবং হাওড় অঞ্চলের পশ্চিম সংলগ্ন এক বিস্তৃত পলিবাহিত সমতল ভূমি, অধূনা খ্যাত ভাটি অঞ্চলের সিংহদ্বার যার পূর্বে- নিকলী ও ইটনা উপজেলা, পশ্চিমে কিশোরগঞ্জ সদর, উত্তরে তাড়াইল ও ইটনা উপজেলা, দক্ষিণে নিকলী ও কিশোরগঞ্জ সদর। এ বেষ্টনে প্রায় দুইশতাধিক বর্গ কিঃমিঃ অঞ্চল করিমগঞ্জ লোক ঐতিহ্য ও বীরত্বে ইতিহাস খ্যাত।

১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ঈশা খাঁ আকবরের শক্তিশালী বাহিনীর মোকাবেলা করেন। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি জমিদার নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন এবং সোরগাঁয়ে তার রাজধানী স্থাপন করেন। এ সময়ে কুচ রাজার নিকট থেকে জঙ্গলবাড়ী দূর্গ দখল করে নেন এবং ভাটি অঞ্চলের শাসন কার্য পরিচালনা ও নিরাপত্তার কারণে জঙ্গলবাড়ীতে দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। আবার এ সময়ে অর্থ্যাৎ ১৫৭৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জঙ্গলবাড়ীর অদূরে বাংলা সাহিত্যের মধ্য যুগের শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি চন্দ্রাবতী পাতুয়াইর গ্রামের বিদগ্ধ ভাষাণ গায়ক দ্বীজবংশী’র ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এবং পিতৃগৃহে বসে রচনা করেন বাংলা ভাষার একমাত্র লোকজ রামায়ণ। ঠিক তখনই সুচি শিল্পের উন্নতিতে জঙ্গলবাড়ী বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিল। জঙ্গলবাড়ী মসলিন কাপড়ের জন্য জগত বিখ্যাত হয়েছিল। জঙ্গলখাস, নয়নমুখ নামক সূক্ষ সুতার তৈরী মসলিন মোগল সম্রাটদের দরবারে সাদরে গৃহীত হয়েছিল। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯০০ শতকের প্রথমার্ধে জেমস্ টেলরের বর্ণনায়। তিনি উলেস্নখ করেছিলেন জঙ্গলবাড়ীতে প্রায় ১০০ ঘর মসলিন তাঁতি পরিবার ছিল।

মধ্যযুগে চন্দ্রাবতী, ঈশা খাঁ, মসলিন শিল্প, বংশীদাস এবং কুচরাজা ও তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত করিমগঞ্জেও সময়ের সাথে সাথে ঘটেছে পরিবর্তন। ফলে এক দিকে ভাব সংগীত, ভাষাণ গান আর গ্রাম্য পালা গানের যেমন পলস্নী কবিরা রচনা করেছিলেন জীবন ঘনিষ্ট গীত ও গীতিকা। অন্যদিকে কৃষক আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ ইত্যাদিতে করিমগঞ্জের বীর সমত্মানেরা রেখেছে অবদান।

বিখ্যাত ‘‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র’’ শিল্পী সাহিত্য রত্নের পরশে করিমগঞ্জ গর্বিত। বীরত্ব গাঁথা, সুচি শিল্প আর সংগ্রামী চেতনার এক উর্বর লীলাভূমি করিমগঞ্জ। দ্বীজবংশী দাস, চন্দ্রাবতীর পাশে ঈশাঁ খাঁ, বীরঙ্গনা সখিনা, কমর উদ্দিন হোসাইন, মুন্সী আজিম উদ্দিন এঁরা করিমগঞ্জের ইতিহাসকে করেছেন সমৃদ্ধ।

================

সংক্ষেপেঃ করিমগঞ্জ উপজেলাটি ২৪২২এবং ২৪৩২উত্তর দ্রাঘিমাংশে এবং ৯০৪৮এবং ৯১০১পূর্ব অক্ষাংশে অবস্থিত।